বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার ৪ টি নীতি কি কি?

বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার ৪ টি নীতি কি কি?

লোকপ্রশাসন ও ব্যবস্থাপনা শাস্ত্রে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা একটি যুগান্তকারী ধারণা। আধুনিক শিল্প ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার ভিত্তি গড়ে উঠেছে মূলত এই তত্ত্বের উপর। বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার ৪ টি নীতি কি কি — এই প্রশ্নটি অনার্স, ডিগ্রি ও বিসিএস পরীক্ষায় বারবার আসে। এই আর্টিকেলে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার সংজ্ঞা, প্রবক্তা, ৪টি মূলনীতি, সুবিধা ও সমালোচনা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।


বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা কাকে বলে?

বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার সংজ্ঞা: বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা হলো এমন একটি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি যেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, তথ্য অনুসন্ধান, বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে কাজের সর্বোত্তম পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয় এবং অনুমান বা হাতুড়ে পদ্ধতির পরিবর্তে বৈজ্ঞানিক নীতিকে ব্যবস্থাপনার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

ইংরেজি: Scientific Management প্রবক্তা: এফ. ডব্লিউ. টেইলর (F. W. Taylor)


বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার জনক কে?

বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার জনক হলেন ফ্রেডারিক উইন্সলো টেইলর (Frederick Winslow Taylor)। টেইলর ১৯১১ সালে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “Principles of Scientific Management”-এ বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার কতিপয় নীতি বা আদর্শ তুলে ধরেন।

বিষয়তথ্য
পূর্ণ নামFrederick Winslow Taylor
জন্ম২০ মার্চ, ১৮৫৬
মৃত্যু১৯১৫
জন্মস্থানফিলাডেলফিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
বিখ্যাত গ্রন্থPrinciples of Scientific Management (১৯১১)
পরিচিতিবৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার জনক

বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার দর্শন

টেইলরের বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার দর্শন মূলত ব্যবস্থাপক ও শ্রমিক শ্রেণীর পারস্পরিক স্বার্থ সংরক্ষণ এবং ৪টি মৌলিক নীতিমালার উপর প্রতিষ্ঠিত।

টেইলর মনে করতেন, শ্রমিক ও ব্যবস্থাপনার মধ্যে সহযোগিতা ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রয়োগে উৎপাদনশীলতা বহুগুণে বাড়ানো সম্ভব।


বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার ৪টি মূলনীতি

নীতি ১: কাজের জন্য প্রকৃত বিজ্ঞানের বিকাশ (The Development of a True Science of Work)

বিজ্ঞানকে যখন একটি সংঘবদ্ধ জ্ঞান বলা হচ্ছে, তখন ব্যবস্থাপনা সংগঠনের শ্রমিকদের সকল কাজের ভার প্রকৃত বিজ্ঞানের প্রয়োগের মাধ্যমে হালকা করা সম্ভব।

এই নীতি অনুসারে প্রতিটি কাজের জন্য সর্বোত্তম পদ্ধতি বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারণ করতে হবে। অনুমান বা অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর না করে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে কাজের “একটি সর্বোত্তম পদ্ধতি” (One Best Way) খুঁজে বের করতে হবে।

মূলকথা: হাতুড়ে বা অনুমাননির্ভর পদ্ধতির পরিবর্তে প্রতিটি কাজে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে।


নীতি ২: বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কর্মী নির্বাচন ও প্রশিক্ষণ (Scientific Selection and Training of Workers)

বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কর্মী নির্বাচন, প্রশিক্ষণদান ও তাদের উন্নয়ন।

এই নীতি অনুসারে যথেচ্ছভাবে কর্মী নিয়োগ না করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সঠিক কাজের জন্য সঠিক ব্যক্তি নির্বাচন করতে হবে। নির্বাচিত কর্মীদের পদ্ধতিগতভাবে প্রশিক্ষণ দিতে হবে যাতে তারা নির্ধারিত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কাজ করতে পারে।

মূলকথা: সঠিক মানুষকে সঠিক জায়গায় নিয়োগ দাও এবং তাকে সঠিকভাবে প্রশিক্ষণ দাও।


নীতি ৩: ব্যবস্থাপনা ও কর্মীদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক (Bringing Together of Scientifically Selected Workers and the Science)

ব্যবস্থাপনা ও কর্মীদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা।

টেইলর বিশ্বাস করতেন, ব্যবস্থাপনা ও শ্রমিকদের মধ্যে বৈরিতার পরিবর্তে সহযোগিতা ও সৌহার্দ্যের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে হবে। উভয়পক্ষের স্বার্থ আলাদা নয় — উভয়েরই লক্ষ্য উৎপাদন বৃদ্ধি।

মূলকথা: ব্যবস্থাপক ও শ্রমিক একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়, বরং একই লক্ষ্যে কাজ করে।


নীতি ৪: ব্যবস্থাপনা ও কর্মীদের মধ্যে কাজের সমবণ্টন (Equal Division of Work and Responsibility)

বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার চতুর্থ নীতি হলো ব্যবস্থাপনা ও কর্মীদের মধ্যে কাজ ও দায়িত্বের সমান ভাগ। ঐতিহ্যগতভাবে প্রায় সব কাজ ও দায়িত্ব শ্রমিকদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হতো। টেইলর মনে করতেন কাজ পরিকল্পনা, সংগঠন ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ব্যবস্থাপকের এবং সেই পরিকল্পনা অনুসারে কাজ বাস্তবায়নের দায়িত্ব শ্রমিকের।

মূলকথা: কাজের পরিকল্পনা ব্যবস্থাপকের কাজ, বাস্তবায়ন শ্রমিকের কাজ।


একনজরে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার ৪টি নীতি

নীতিমূল বিষয়
১. বিজ্ঞানের বিকাশহাতুড়ে পদ্ধতির পরিবর্তে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কাজ
২. বৈজ্ঞানিক নির্বাচন ও প্রশিক্ষণসঠিক কাজে সঠিক মানুষ নির্বাচন ও প্রশিক্ষণ
৩. সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কব্যবস্থাপক ও শ্রমিকের মধ্যে সহযোগিতা
৪. কাজের সমবণ্টনপরিকল্পনা ব্যবস্থাপকের, বাস্তবায়ন শ্রমিকের

বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার সুবিধা

  • উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়
  • অপচয় কমে এবং দক্ষতা বাড়ে
  • কর্মীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়ন হয়
  • কাজের মান নিশ্চিত হয়
  • ব্যবস্থাপক ও শ্রমিকের সম্পর্ক উন্নত হয়

বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার সমালোচনা

বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার কার্যক্রম অনুসরণ করতে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। এছাড়া —

  • মানবিক দিক উপেক্ষা করা হয়
  • শ্রমিকদের যন্ত্রের মতো বিবেচনা করার প্রবণতা
  • C.S. Myers বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনাকে অবৈজ্ঞানিক, সমাজবিরোধী এবং মানসিক বিরোধী বলে অভিহিত করেছেন
  • শুধু শিল্পক্ষেত্রে প্রযোজ্য — সর্বত্র কার্যকর নয়

(FAQ)

প্রশ্ন: বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার ৪টি নীতি কি কি?

উত্তর: ১. কাজের জন্য প্রকৃত বিজ্ঞানের বিকাশ, ২. বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কর্মী নির্বাচন ও প্রশিক্ষণ, ৩. ব্যবস্থাপনা ও কর্মীদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক এবং ৪. কাজ ও দায়িত্বের সমান বণ্টন।

প্রশ্ন: বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার জনক কে?

উত্তর: ফ্রেডারিক উইন্সলো টেইলর (F. W. Taylor)

প্রশ্ন: টেইলরের বিখ্যাত গ্রন্থের নাম কী?

উত্তর: “Principles of Scientific Management” (১৯১১)।

প্রশ্ন: বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার মূলকথা কী?

উত্তর: হাতুড়ে বা অনুমাননির্ভর পদ্ধতির পরিবর্তে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করে সর্বোচ্চ দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা অর্জন করা।

প্রশ্ন: বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার ইংরেজি কী?

উত্তর: Scientific Management।

প্রশ্ন: টেইলরের বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার প্রধান সমালোচনা কী?

উত্তর: মানবিক দিক উপেক্ষা, শ্রমিকদের যন্ত্রের মতো বিবেচনা এবং বাস্তবায়নে অতিরিক্ত ব্যয়।


উপসংহার

বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার ৪টি নীতি — বিজ্ঞানের বিকাশ, বৈজ্ঞানিক নির্বাচন ও প্রশিক্ষণ, সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক এবং কাজের সমবণ্টন — আধুনিক ব্যবস্থাপনার ভিত্তি গড়ে দিয়েছে। টেইলরের এই তত্ত্ব শিল্পজগতে বিপ্লব এনেছিল এবং আজও প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনায় প্রাসঙ্গিক। সমালোচনা থাকলেও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার মূলনীতিগুলো আধুনিক সংগঠন ও প্রশাসনের অনুশীলনে গভীরভাবে প্রোথিত।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *