চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী বলতে কী বোঝায়? বৈশিষ্ট্য, প্রকারভেদ ও ভূমিকা
চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী বলতে কী বোঝায়? বৈশিষ্ট্য, প্রকারভেদ ও ভূমিকা. আধুনিক গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। কোনো একটি দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী একটি প্রভাবশালী অঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হয়। সরকারি নীতিনির্ধারণকে নিজেদের স্বার্থে প্রভাবিত করা এই গোষ্ঠীগুলোর মূল লক্ষ্য। চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী বলতে কী বোঝায় — এই প্রশ্নটি পৌরনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও বিসিএস পরীক্ষায় বারবার আসে। এই আর্টিকেলে চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য, প্রকারভেদ, পদ্ধতি এবং রাজনৈতিক দলের সাথে পার্থক্য বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো। chap srishtikari gosthir sanga dao.
চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী বলতে কী বোঝায়? বৈশিষ্ট্য, প্রকারভেদ ও ভূমিকা
চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী (Pressure Group) হলো এমন কিছু সংগঠিত মানুষের সমষ্টি, যারা সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দল গঠন বা রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের চেষ্টা না করে, নিজেদের নির্দিষ্ট শ্রেণিগত বা পেশাগত স্বার্থ রক্ষায় সরকারের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করে।
চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী কি? চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী বলতে কী বোঝায়?
চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী হচ্ছে এমন একটি গোষ্ঠী যারা সরকারের সমালোচনা করে, সরকারি সিদ্ধান্তকে নিজেদের স্বার্থের অনুকূলে আনার চেষ্টা করে।
বিস্তারিত সংজ্ঞা: চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী বলতে এমন এক গোষ্ঠীকে বোঝায়, যার সদস্যগণ সমজাতীয় মনোভাব এবং অভিন্ন স্বার্থের দ্বারা আবদ্ধ হয়ে সরকারের নীতিনির্ধারণকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে।
ইংরেজি পরিভাষা: Pressure Group / Interest Group
সহজ কথায়, নির্দিষ্ট স্বার্থ রক্ষার জন্য সংগঠিত হয়ে সরকারকে প্রভাবিত করার চেষ্টাকারী গোষ্ঠীই চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী।
বিভিন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর সংজ্ঞা
| রাষ্ট্রবিজ্ঞানী | সংজ্ঞা |
|---|---|
| J. D. Miller | চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীসমূহ সর্বাধিক লক্ষণীয় এবং সর্বাপেক্ষা সুসংহত স্বার্থের প্রতিভূস্বরূপ |
| অধ্যাপক নিউম্যান | চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী আইনসভার বাইরে থেকে সরকারি নীতিকে প্রভাবিত করে |
| A. R. Ball | চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী হলো এমন একটি সংগঠন যা সরকারি সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে, কিন্তু নিজে ক্ষমতায় যেতে চায় না |
চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্য
চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
১. সংগঠিত গোষ্ঠী: চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী বেসরকারি ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে গঠিত একটি সংগঠিত গোষ্ঠী। এটি অসংগঠিত জনতা নয়।
২. অভিন্ন স্বার্থ: গোষ্ঠীর সকল সদস্য একটি বিশেষ স্বার্থ বা লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ। ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে গোষ্ঠীগত স্বার্থই এখানে মুখ্য।
৩. রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের লক্ষ্য নেই: সর্বদা সরকারি সিদ্ধান্তকে নিজেদের স্বার্থের অনুকূলে আনার চেষ্টা করে, তবে চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী সরকারি ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করে না। এটি রাজনৈতিক দল থেকে তাদের মূল পার্থক্য।
৪. সরকারকে প্রভাবিত করা: নীতিনির্ধারণকে নিজেদের অনুকূলে আনতে সরকার, সংসদ ও প্রশাসনের উপর চাপ প্রয়োগ করে।
৫. প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উপায়ে কাজ: প্রচার, আন্দোলন, ধর্মঘট, লবিং — বিভিন্ন পদ্ধতিতে কার্যক্রম পরিচালনা করে।
৬. বিশেষ বিষয়ে সক্রিয়: সব বিষয়ে নয়, নির্দিষ্ট এক বা কয়েকটি বিষয়ে সক্রিয় থাকে।
চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর প্রকারভেদ
G. A. Almond ও অন্যান্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠীকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে শ্রেণিবদ্ধ করেছেন।
১. অ্যাসোসিয়েশনাল গোষ্ঠী (Associational Groups)
সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সংগঠিত গোষ্ঠী।
- উদাহরণ: ট্রেড ইউনিয়ন, ব্যবসায়ী সমিতি, পেশাজীবী সংগঠন
২. নন-অ্যাসোসিয়েশনাল গোষ্ঠী (Non-Associational Groups)
অনানুষ্ঠানিক ও বিক্ষিপ্তভাবে কাজ করে।
- উদাহরণ: ধর্মীয় গোষ্ঠী, জাতিগত সংগঠন
৩. প্রাতিষ্ঠানিক গোষ্ঠী (Institutional Groups)
সরকারি বা আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকে কাজ করে।
- উদাহরণ: সামরিক বাহিনী, পুলিশ সংগঠন, আমলা গোষ্ঠী
৪. অসংগঠিত গোষ্ঠী (Anomic Groups)
হঠাৎ গড়ে ওঠা স্বতঃস্ফূর্ত গোষ্ঠী।
- উদাহরণ: দাঙ্গাকারী জনতা, বিক্ষোভ আন্দোলন
চাপ প্রয়োগের পদ্ধতি
চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী বিভিন্ন পদ্ধতিতে সরকারকে প্রভাবিত করে:
প্রত্যক্ষ পদ্ধতি:
- সংসদ সদস্যদের সাথে সাক্ষাৎ ও আলোচনা (লবিং)
- সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ
- আদালতে মামলা দায়ের
- মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি প্রদান
পরোক্ষ পদ্ধতি:
- গণমাধ্যমে প্রচারণা
- ধর্মঘট ও কর্মবিরতি
- জনমত গঠন ও সচেতনতা সৃষ্টি
- নির্বাচনে প্রার্থীদের সমর্থন বা বিরোধিতা
চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক দলের পার্থক্য
| বিষয় | চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী | রাজনৈতিক দল |
|---|---|---|
| মূল লক্ষ্য | নির্দিষ্ট স্বার্থ রক্ষা | রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জন |
| নির্বাচন | নির্বাচনে অংশ নেয় না | নির্বাচনে অংশ নেয় |
| সদস্যপদ | নির্দিষ্ট স্বার্থভিত্তিক | ব্যাপক ও বৈচিত্র্যময় |
| দায়িত্ব | কোনো সরকারি দায়িত্ব নেই | সরকার গঠনের দায়িত্ব নেয় |
| পরিধি | সীমিত ও বিশেষায়িত | ব্যাপক ও সামগ্রিক |
| উদাহরণ | ট্রেড ইউনিয়ন, চিকিৎসক সমিতি | আওয়ামী লীগ, বিএনপি |
বাংলাদেশে চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর উদাহরণ
বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী সক্রিয়:
- শ্রমিক সংগঠন: পোশাক শ্রমিক ফেডারেশন, ট্রেড ইউনিয়ন
- পেশাজীবী সংগঠন: বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (BMA), বার কাউন্সিল
- ব্যবসায়ী সংগঠন: এফবিসিসিআই, ডিসিসিআই
- শিক্ষক সংগঠন: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি
- কৃষক সংগঠন: বিভিন্ন কৃষক ফেডারেশন
- সুশীল সমাজ: টিআইবি, সিপিডি
চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর গুরুত্ব ও ভূমিকা
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ:
ইতিবাচক ভূমিকা:
- বিভিন্ন শ্রেণির স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে
- সরকারকে জবাবদিহিমূলক রাখে
- নাগরিকদের রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়ায়
- নীতিনির্ধারণে বিশেষজ্ঞ মতামত সরবরাহ করে
নেতিবাচক দিক:
- সংকীর্ণ গোষ্ঠীস্বার্থ সামগ্রিক জাতীয় স্বার্থের বিরোধী হতে পারে
- অর্থ ও ক্ষমতাবান গোষ্ঠী বেশি প্রভাবশালী হয়
- দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হতে পারে
(FAQ)
প্রশ্ন: চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী বলতে এমন একটি সংগঠিত গোষ্ঠীকে বোঝায় যারা নির্দিষ্ট স্বার্থ রক্ষার জন্য সরকারের নীতিনির্ধারণকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে।
প্রশ্ন: চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর ইংরেজি কী?
উত্তর: Pressure Group বা Interest Group।
প্রশ্ন: চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী কত প্রকার?
উত্তর: প্রধানত চার প্রকার — অ্যাসোসিয়েশনাল, নন-অ্যাসোসিয়েশনাল, প্রাতিষ্ঠানিক ও অসংগঠিত গোষ্ঠী।
প্রশ্ন: চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক দলের মূল পার্থক্য কী?
উত্তর: রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় যেতে চায়, কিন্তু চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী ক্ষমতা দখল নয়, শুধু নীতিনির্ধারণকে প্রভাবিত করতে চায়।
প্রশ্ন: বাংলাদেশে চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর উদাহরণ কী?
উত্তর: বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (BMA), পোশাক শ্রমিক ফেডারেশন, এফবিসিসিআই, টিআইবি ইত্যাদি।
প্রশ্ন: চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী কীভাবে সরকারকে প্রভাবিত করে?
উত্তর: লবিং, ধর্মঘট, গণমাধ্যমে প্রচারণা, স্মারকলিপি প্রদান ও জনমত গঠনের মাধ্যমে।
উপসংহার
চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী আধুনিক গণতান্ত্রিক রাজনীতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এর আলোচনা ব্যতিরেকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে যথার্থ অনুধাবন ও মূল্যায়ন সম্ভব নয়। সরকার ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে এই গোষ্ঠীগুলো। তবে এদের ভূমিকা ইতিবাচক না নেতিবাচক হবে তা নির্ভর করে কোন স্বার্থে এবং কোন পদ্ধতিতে তারা কাজ করছে তার উপর। সুশাসিত রাষ্ট্রে চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী গণতন্ত্রকে আরও কার্যকর করতে পারে।
