রাষ্ট্রবিজ্ঞান কী? রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রকৃতি ও পরিধি আলোচনা
রাষ্ট্রবিজ্ঞান (Political Science) হলো সমাজবিজ্ঞানের একটি শাখা যেখানে রাষ্ট্র, সরকার, ক্ষমতা, রাজনীতি এবং মানুষের রাজনৈতিক আচরণ নিয়ে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে আলোচনা ও গবেষণা করা হয়।
Political Science শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ “Polis” থেকে, যার অর্থ নগররাষ্ট্র। প্রাচীন গ্রিসে প্রতিটি নগরকে একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য করা হতো। সেই নগররাষ্ট্রের যাবতীয় সমস্যা ও সমাধান নিয়ে যে শাস্ত্র আলোচনা করত তাই রাষ্ট্রবিজ্ঞান।
বিভিন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর সংজ্ঞা
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বিভিন্নভাবে এর সংজ্ঞা দিয়েছেন:
| রাষ্ট্রবিজ্ঞানী | সংজ্ঞা |
|---|---|
| অ্যারিস্টটল | রাষ্ট্রবিজ্ঞান হলো সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান |
| গার্নার | রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শুরু ও শেষ রাষ্ট্রকে নিয়ে |
| গেটেল | রাষ্ট্রবিজ্ঞান রাষ্ট্রের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করে |
| লাস্কি | সংগঠিত রাষ্ট্রের প্রেক্ষিতে মানবজীবনের আলোচনাই রাষ্ট্রবিজ্ঞান |
| পল জানে | রাষ্ট্রের ভিত্তি ও সরকারের নীতিমালা নিয়ে আলোচনা করে যে শাস্ত্র |
| বার্জেস | রাষ্ট্রবিজ্ঞান হলো স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিজ্ঞান |
| সিলি | সরকার সম্পর্কে অনুসন্ধান করাই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কাজ |
সংক্ষেপে বলা যায়: মানুষের রাজনৈতিক জীবনের সাথে সম্পর্কিত সকল বিষয়, প্রতিষ্ঠান ও কার্যাবলি নিয়ে যে শাস্ত্র বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে আলোচনা করে, তাকেই রাষ্ট্রবিজ্ঞান বলে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রকৃতি
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রকৃতি নিয়ে দুটি বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান কি বিজ্ঞান?
হ্যাঁ, বিজ্ঞান — এই মতের পক্ষে যুক্তি:
- রাষ্ট্রবিজ্ঞান পর্যবেক্ষণ, গবেষণা ও তথ্যের উপর ভিত্তি করে আলোচনা করে
- নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে (তুলনামূলক, পরিসংখ্যানগত) বিশ্লেষণ করা হয়
- সর্বজনীন নীতি ও সূত্র প্রণয়নের চেষ্টা করা হয়
না, বিজ্ঞান নয় — এই মতের পক্ষে যুক্তি:
- মানুষের আচরণ প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের মতো পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা যায় না
- রাজনৈতিক ঘটনাবলি সর্বদা পূর্বানুমানযোগ্য নয়
- মূল্যবোধ ও নৈতিকতার প্রভাব থাকে
গ্রহণযোগ্য মত: রাষ্ট্রবিজ্ঞান একটি সামাজিক বিজ্ঞান — প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের মতো নিখুঁত না হলেও এটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে রাজনৈতিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান একটি গতিশীল বিজ্ঞান
সমাজ ও সভ্যতার পরিবর্তনের সাথে সাথে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনার পরিধিও প্রসারিত হচ্ছে। তাই একে প্রগতিশীল বিজ্ঞান (Progressive Science) বলা হয়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিধি
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক। UNESCO ১৯৪৮ সালে একটি সম্মেলনে চারটি মূল বিষয় রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত বলে চিহ্নিত করে:
১. রাষ্ট্রতত্ত্ব ও এর ইতিহাস ২. রাষ্ট্রের সংবিধান, প্রতিষ্ঠান ও তুলনামূলক সরকার ব্যবস্থা ৩. রাজনৈতিক দল, নাগরিকের অংশগ্রহণ ও জনমত ৪. আন্তর্জাতিক আইন ও আন্তর্জাতিক সংস্থা
এর বাইরেও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিধিতে রয়েছে:
রাষ্ট্র ও সরকার: রাষ্ট্রের উৎপত্তি, প্রকৃতি, কার্যাবলি, সরকারের বিভিন্ন রূপ (গণতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র, যুক্তরাষ্ট্রীয় ইত্যাদি) এবং সরকারের অঙ্গসমূহ।
সংবিধান ও আইন: শাসনতন্ত্র, নাগরিক অধিকার, বিচারব্যবস্থা এবং আইনের শাসন।
রাজনৈতিক তত্ত্ব ও দর্শন: স্বাধীনতা, সাম্য, ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ।
রাজনৈতিক দল ও জনমত: রাজনৈতিক দলের গঠন ও কার্যাবলি, নির্বাচন ব্যবস্থা এবং জনমতের ভূমিকা।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক: রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক সংগঠন (জাতিসংঘ), কূটনীতি এবং বৈশ্বিক রাজনীতি।
উপসংহার
রাষ্ট্রবিজ্ঞান একটি গুরুত্বপূর্ণ ও গতিশীল সামাজিক বিজ্ঞান। এর পরিধি কেবল রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং মানুষের সামগ্রিক রাজনৈতিক জীবন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক দর্শন পর্যন্ত বিস্তৃত। আধুনিক যুগে এর পরিধি প্রতিনিয়ত প্রসারিত হচ্ছে।
(FAQ)
উত্তর: মানুষের রাজনৈতিক জীবনের সাথে সম্পর্কিত সকল বিষয় নিয়ে যে শাস্ত্র বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে আলোচনা করে তাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বলে।
উত্তর: অ্যারিস্টটলকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক বলা হয়। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি।
উত্তর: গার্নার বলেছেন, “রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শুরু ও শেষ রাষ্ট্রকে নিয়ে।”
উত্তর: রাষ্ট্র, সরকার, সংবিধান, রাজনৈতিক দল, জনমত, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক তত্ত্ব ও দর্শন।
উত্তর: কারণ সমাজ ও সভ্যতার পরিবর্তনের সাথে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনার পরিধিও প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত ও প্রসারিত হচ্ছে।
