লগ্নক কাকে বলে ? সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ
বাংলা ব্যাকরণে লগ্নক একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা, যা শব্দকে পদে রূপান্তরিত করার প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে। নবম-দশম শ্রেণির ব্যাকরণ বই থেকে শুরু করে বিসিএস, ব্যাংক ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় লগ্নক সম্পর্কিত প্রশ্ন প্রায়ই আসে। এই আর্টিকেলে আমরা বিস্তারিতভাবে জানব — লগ্নক কাকে বলে, লগ্নক কত প্রকার ও কী কী, এবং সলগ্নক ও অলগ্নক পদ কাকে বলে।
লগ্নক কাকে বলে?
লগ্নক-এর সংজ্ঞা: বাংলা ব্যাকরণে, শব্দ যখন বাক্যে ব্যবহৃত হয় তখন তার সঙ্গে কিছু শব্দাংশ যুক্ত হয় — এই শব্দাংশগুলোকেই লগ্নক বলে।
অন্যভাবে বলা যায়, শব্দ পদে পরিণত হওয়ার পর তার সাথে অতিরিক্ত যে বর্ণ বা বর্ণগুচ্ছ যুক্ত হয়ে শব্দের অর্থ বা ব্যবহারকে সুনির্দিষ্ট করে তোলে, সেগুলোকে লগ্নক বলে।
সহজ কথায়: শব্দের সাথে লেগে থাকা ছোট ছোট শব্দাংশ যেগুলো পদের অর্থ বা কাজ নির্ধারণ করে — সেগুলোই লগ্নক।
শব্দ ও পদের সম্পর্ক
লগ্নক বোঝার আগে শব্দ ও পদের পার্থক্য জানা জরুরি:
- শব্দ: এক বা একাধিক ধ্বনির অর্থপূর্ণ সমষ্টিকে শব্দ বলে। যেমন — ছেলে, বই, পড়া।
- পদ: শব্দ যখন বাক্যের মধ্যে ব্যবহৃত হয়, তখন তাকে পদ বলে।
শব্দ যখন বাক্যে ব্যবহৃত হয়ে পদে পরিণত হয়, তখন তার সঙ্গে কিছু শব্দাংশ যুক্ত হয়। এই যুক্ত শব্দাংশগুলোই লগ্নক।
উদাহরণ: “ছেলেরা মাঠে খেলে।” — এখানে ‘ছেলেরা’ পদের ‘রা’ এবং ‘খেলে’ পদের ‘এ’ হলো লগ্নক।
লগ্নক কত প্রকার ও কী কী?
বাংলা ব্যাকরণে লগ্নক প্রধানত চার প্রকার:
১. বিভক্তি ২. নির্দেশক ৩. বচন ৪. বলক
লগ্নকের প্রকারভেদ বিস্তারিত
১. বিভক্তি
ক্রিয়ার কাল নির্দেশ এবং কারক বোঝানোর জন্য পদের সঙ্গে যেসব শব্দাংশ যুক্ত হয়, সেগুলোকে বিভক্তি বলে।
বিভক্তি দুই প্রকার:
ক) কারক-বিভক্তি (শব্দবিভক্তি): নামপদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কারক নির্দেশ করে।
| পদ | লগ্নক (বিভক্তি) |
|---|---|
| কৃষকের | -এর (সম্বন্ধ কারক) |
| মাঠে | -এ (অধিকরণ কারক) |
| রহিমকে | -কে (কর্ম কারক) |
খ) ক্রিয়া-বিভক্তি: ক্রিয়াপদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাল ও পক্ষ নির্দেশ করে।
| পদ | লগ্নক (বিভক্তি) |
|---|---|
| করলাম | -লাম (উত্তম পুরুষ, অতীত কাল) |
| পড়ি | -ই (উত্তম পুরুষ, বর্তমান কাল) |
| যাবে | -বে (প্রথম পুরুষ, ভবিষ্যৎ কাল) |
২. নির্দেশক
যেসব শব্দাংশ পদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পদকে নির্দিষ্ট করে তোলে, সেগুলোকে নির্দেশক বা পদাশ্রিত নির্দেশক বলে।
নির্দেশক দুই প্রকার:
ক) একবচনাত্মক নির্দেশক: পদকে একবচনের রূপ দেয়।
- যেমন: -টি, -টা, -খানা, -খানি, -টুকু
- উদাহরণ: বইটি, মানুষটা, কাপড়খানা, একটুকু
খ) বহুবচনাত্মক নির্দেশক: পদকে বহুবচনের রূপ দেয়।
- যেমন: -গুলো, -গুলি, -গুলা
- উদাহরণ: বইগুলো, মানুষগুলি
৩. বচন
যেসব শব্দাংশ পদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পদের সংখ্যা বোঝায়, সেগুলোকে বচন বলে।
| বচন-লগ্নক | উদাহরণ |
|---|---|
| -রা | ছেলেরা, মেয়েরা |
| -গণ, -বৃন্দ | শিক্ষকগণ, দর্শকবৃন্দ |
| -দের | ছাত্রদের, মানুষদের |
| -সব | ভাইসব |
উদাহরণ বাক্য: “ছেলেরা মাঠে খেলছে।” — এখানে ‘রা’ হলো বচন-লগ্নক।
৪. বলক
যেসব শব্দাংশ পদের সঙ্গে যুক্ত হলে বক্তব্য জোরালো হয় বা বিশেষ জোর দেওয়া হয়, সেগুলোকে বলক বলে।
বাংলায় প্রধান বলক দুটি: ই এবং ও
| পদ | লগ্নক (বলক) | অর্থ |
|---|---|---|
| তখনই | -ই | তখনই, অন্য সময়ে নয় |
| এখনও | -ও | এখন পর্যন্তও |
| আমিই | -ই | আমি এবং কেউ নয় |
| সেও | -ও | সে-ও বাদ নয় |
উদাহরণ: “আমি বইটি এখনই পড়ব।” — ‘এখনই’ পদের ই হলো বলক।
সলগ্নক ও অলগ্নক পদ কাকে বলে?
বাক্যের পদগুলোকে লগ্নকের উপস্থিতির ভিত্তিতে দুই ভাগে ভাগ করা হয়:
সলগ্নক পদ: বাক্যে যেসব পদের সাথে লগ্নক যুক্ত থাকে, সেগুলোকে সলগ্নক পদ বলে।
অলগ্নক পদ: বাক্যে যেসব পদের সাথে কোনো লগ্নক যুক্ত থাকে না, সেগুলোকে অলগ্নক পদ বলে।
উদাহরণ: “ছেলেরা ক্রিকেট খেলে।”
- ছেলেরা → সলগ্নক পদ (লগ্নক: রা)
- খেলে → সলগ্নক পদ (লগ্নক: এ)
- ক্রিকেট → অলগ্নক পদ (কোনো লগ্নক নেই)
আরেকটি উদাহরণ: “নৌকার ছইয়ে নীল মাছরাঙাটি বসে আছে।”
- নীল → অলগ্নক পদ
- নৌকার, ছইয়ে, মাছরাঙাটি → সলগ্নক পদ
লগ্নক ও প্রত্যয়ের পার্থক্য
অনেকেই লগ্নক এবং প্রত্যয়কে গুলিয়ে ফেলেন। এদের মধ্যে পার্থক্য হলো:
| বিষয় | লগ্নক | প্রত্যয় |
|---|---|---|
| কখন যুক্ত হয় | শব্দ বাক্যে ব্যবহৃত হলে পদের সঙ্গে | শব্দ তৈরির সময় শব্দমূলের সঙ্গে |
| কাজ | পদের অর্থ ও ব্যবহার নির্ধারণ করে | নতুন শব্দ তৈরি করে |
| উদাহরণ | ‘ছেলেরা’-র ‘রা’ | ‘গায়ক’-এর ‘অক’ |
একনজরে লগ্নকের সারসংক্ষেপ
| লগ্নকের ধরন | কাজ | উদাহরণ |
|---|---|---|
| বিভক্তি | কারক ও ক্রিয়ার কাল নির্দেশ | কৃষকের (-এর), করলাম (-লাম) |
| নির্দেশক | পদকে নির্দিষ্ট করা | বইটি (-টি), বইগুলো (-গুলো) |
| বচন | সংখ্যা বোঝানো | ছেলেরা (-রা), শিক্ষকগণ (-গণ) |
| বলক | বক্তব্যে জোর দেওয়া | তখনই (-ই), এখনও (-ও) |
FAQ
উত্তর: শব্দ বাক্যে ব্যবহৃত হওয়ার সময় পদের সঙ্গে যে শব্দাংশ যুক্ত হয়ে পদের অর্থ বা ব্যবহার নির্ধারণ করে, তাকে লগ্নক বলে।
উত্তর: লগ্নক চার প্রকার — বিভক্তি, নির্দেশক, বচন ও বলক।
উত্তর: বাক্যে যেসব পদে লগ্নক যুক্ত থাকে, সেগুলোকে সলগ্নক পদ বলে।
উত্তর: বাক্যে যেসব পদে কোনো লগ্নক থাকে না, সেগুলোকে অলগ্নক পদ বলে।
উত্তর: যেসব শব্দাংশ পদের সঙ্গে যুক্ত হলে বক্তব্য জোরালো হয়, সেগুলোকে বলক বলে। বাংলায় প্রধান বলক ‘ই’ এবং ‘ও’।
উত্তর: যেসব শব্দাংশ পদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পদকে নির্দিষ্ট করে, সেগুলোকে নির্দেশক বলে। যেমন: -টি, -টা, -খানা, -গুলো।
উত্তর: না। প্রত্যয় নতুন শব্দ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়, কিন্তু লগ্নক শব্দ পদে পরিণত হওয়ার পর যুক্ত হয়। দুটি আলাদা ধারণা।
উপসংহার
লগ্নক বাংলা ব্যাকরণের একটি অপরিহার্য বিষয়। শব্দকে বাক্যে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হলে লগ্নকের কাজ বুঝতে হয়। বিভক্তি দিয়ে কারক বোঝানো, নির্দেশক দিয়ে পদকে নির্দিষ্ট করা, বচন দিয়ে সংখ্যা নির্দেশ করা এবং বলক দিয়ে বক্তব্যে জোর দেওয়া — এই চারটি কাজই লগ্নকের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। পরীক্ষার প্রস্তুতিতে লগ্নকের সংজ্ঞা, প্রকারভেদ এবং উদাহরণ ভালোভাবে আয়ত্ত করে রাখলে এই বিষয়ে ভালো নম্বর পাওয়া সহজ হবে।
