প্লেটোর সাম্যবাদ কি? সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য ও সমালোচনা
মূলগ্রন্থ: Republic (প্রজাতন্ত্র) ইংরেজি পরিভাষা: Plato’s Theory of Communism
প্লেটোর সাম্যবাদের উদ্দেশ্য
প্লেটোর সাম্যবাদের মূল লক্ষ্য ছিল তিনটি:
১. দুর্নীতিমুক্ত শাসন নিশ্চিত করা: শাসক শ্রেণী যাতে ব্যক্তিগত লোভ-লালসার বশবর্তী না হয়।
২. ঐক্য প্রতিষ্ঠা: রাষ্ট্রে সর্বোচ্চ ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা। প্লেটো মনে করতেন, “আমার” ও “তোমার” এই ধারণাই বিভেদের মূল।
৩. ন্যায়ধর্ম প্রতিষ্ঠা: সাম্যবাদের মূল লক্ষ্য মানুষের চিত্তকে পরিপূর্ণরূপে পরিশুদ্ধ করে ন্যায়ধর্মের অনুগত করা।
প্লেটোর সাম্যবাদের দুটি ভাগ
প্লেটোর সাম্যবাদ দুটি প্রধান ভাগে বিভক্ত:
১. সম্পত্তির সাম্যবাদ (Communism of Property)
প্লেটো তাঁর সাম্যবাদ ব্যবস্থায় শাসক এবং সৈনিক শ্রেণীর জন্য ব্যক্তিগত সম্পত্তি প্রথার বিলোপ সাধন করতে চেয়েছেন। কারণ তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, ব্যক্তিগত সম্পত্তি মানুষকে স্বার্থান্বেষী এবং লোভী করে তোলে।
মূল বিধান:
- অভিভাবক ও সৈনিক শ্রেণী কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি রাখতে পারবে না
- তারা রাষ্ট্র-নির্ধারিত ব্যারাকে বাস করবে
- রাষ্ট্রই তাদের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করবে
- সোনা-রুপা স্পর্শ করা নিষিদ্ধ
সতর্কতা: এই বিধান শুধু অভিভাবক ও সৈনিক শ্রেণীর জন্য — কৃষক ও কারিগর শ্রেণী ব্যক্তিগত সম্পত্তি রাখতে পারবে।
২. পরিবারের সাম্যবাদ (Communism of Family)
কেবলমাত্র সম্পত্তির উৎখাত হলেই সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠিত হবে না, এর জন্য পরিবারেরও বিলুপ্তির প্রয়োজন বলে প্লেটো বিশ্বাস করতেন। পরিবারকে তিনি জ্ঞানীদের অপচয়ের স্থান বলে বর্ণনা করেন।
মূল বিধান:
- অভিভাবক শ্রেণীর কোনো স্থায়ী বৈবাহিক সম্পর্ক থাকবে না
- নারী ও পুরুষ উভয়েই শাসন ও সামরিক দায়িত্ব পালন করতে পারবে
- সন্তান জন্মের পর রাষ্ট্র তাদের লালন-পালন করবে — পিতামাতা সন্তানকে চিনবে না
- বিবাহ হবে রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত — কেবল উৎকৃষ্ট বংশধর সৃষ্টির জন্য
প্লেটোর সাম্যবাদের বৈশিষ্ট্য
প্লেটোর সাম্যবাদ ব্যবস্থায় অভিভাবক শ্রেণীর কোনো প্রকার ব্যক্তিগত সম্পত্তি থাকতে পারবে না। তাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব রাষ্ট্র গ্রহণ করবে। সাম্যবাদের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
- শ্রেণি-নির্দিষ্ট: শুধুমাত্র শাসক ও সৈনিক শ্রেণীর জন্য — সর্বজনীন নয়
- রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত: রাষ্ট্রই সব ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করবে
- ঐক্যমুখী: “আমার” ও “তোমার” ধারণা দূর করে ঐক্য প্রতিষ্ঠা
- নৈতিক উদ্দেশ্যে: লোভ, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি দূর করার জন্য
- পুরুষ-নারী সমান: নারীরাও পুরুষের মতো শাসন ও সামরিক দায়িত্ব পাবে
প্লেটোর সাম্যবাদের সমালোচনা
প্লেটোর সাম্যবাদ তত্ত্ব প্রশংসার দাবিদার হলেও বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েছে:
অ্যারিস্টটলের সমালোচনা: অ্যারিস্টটল প্লেটোর সবচেয়ে তীব্র সমালোচক। তিনি বলেছেন — সম্পত্তির সাম্যবাদ মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে। মানুষ স্বভাবতই নিজের সম্পত্তিতে বেশি যত্নশীল।
পরিবার বিলোপের বিরুদ্ধে: পরিবার মানুষের সবচেয়ে স্বাভাবিক প্রতিষ্ঠান। পরিবার বিলোপ করলে মানবিক আবেগ ও সম্পর্কের বিনাশ হবে। পিতামাতা-সন্তানের স্বাভাবিক বন্ধন একটি মৌলিক মানবিক অধিকার।
শুধু এক শ্রেণীর জন্য: প্লেটোর সাম্যবাদ সর্বজনীন নয় — শুধু শাসক ও সৈনিক শ্রেণীর জন্য। কৃষক ও কারিগর শ্রেণী ব্যক্তিগত সম্পত্তি রাখতে পারে — এটি বৈষম্যমূলক।
অবাস্তব ও কাল্পনিক: মানব প্রকৃতির বিরুদ্ধে এ ধরনের ব্যবস্থা বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
প্লেটোর সাম্যবাদ ও আধুনিক সাম্যবাদের পার্থক্য
প্লেটোর সাম্যবাদ ও মার্কসবাদী আধুনিক সাম্যবাদ এক নয়:
| বিষয় | প্লেটোর সাম্যবাদ | আধুনিক সাম্যবাদ (মার্কসবাদ) |
|---|---|---|
| উদ্দেশ্য | নৈতিক বিশুদ্ধতা ও দুর্নীতিমুক্ত শাসন | শ্রেণিশোষণ দূর করা |
| প্রযোজ্যতা | শুধু শাসক ও সৈনিক শ্রেণীর জন্য | সমাজের সকল শ্রেণীর জন্য |
| সম্পত্তি | শুধু শাসকদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বিলোপ | সকলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বিলোপ |
| মালিকানা | রাষ্ট্রীয় মালিকানা আংশিক | উৎপাদনের উপকরণে সম্পূর্ণ সামষ্টিক মালিকানা |
| পরিবার | অভিভাবক শ্রেণীতে পরিবার বিলোপ | পরিবার বিলোপের কথা বলে না |
| ভিত্তি | নৈতিক ও আদর্শবাদী | অর্থনৈতিক ও বস্তুবাদী |
| প্রবক্তা | প্লেটো (৪২৮-৩৪৮ খ্রিপূ) | কার্ল মার্কস (১৮১৮-১৮৮৩) |
প্লেটোর সাম্যবাদের আধুনিক মূল্যায়ন
প্লেটোর সাম্যবাদ সমালোচিত হলেও এর মধ্যে কিছু প্রগতিশীল দিক রয়েছে:
- নারীর সমান অধিকারের কথা বলেছেন — যা সেই যুগে অত্যন্ত বিপ্লবী ছিল
- শাসকদের দুর্নীতিমুক্ত রাখার প্রচেষ্টা প্রশংসনীয়
- ক্ষমতাসীনদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান
(FAQ)
প্রশ্ন: প্লেটোর সাম্যবাদ কি?
উত্তর: আদর্শ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অভিভাবক ও সৈনিক শ্রেণীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও পরিবার বিলোপের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত শাসন প্রতিষ্ঠার যে প্রস্তাব প্লেটো করেছিলেন তাকে প্লেটোর সাম্যবাদ বলে।
প্রশ্ন: প্লেটোর সাম্যবাদ কত প্রকার?
উত্তর: দুই প্রকার — সম্পত্তির সাম্যবাদ ও পরিবারের সাম্যবাদ।
প্রশ্ন: প্লেটোর সাম্যবাদ কোন গ্রন্থে বর্ণিত?
উত্তর: প্লেটোর বিখ্যাত গ্রন্থ “Republic” (প্রজাতন্ত্র)-এ।
প্রশ্ন: প্লেটোর সাম্যবাদ কি সর্বজনীন?
উত্তর: না। এটি শুধু শাসক ও সৈনিক শ্রেণীর জন্য — কৃষক ও কারিগর শ্রেণী ব্যক্তিগত সম্পত্তি রাখতে পারে।
প্রশ্ন: প্লেটোর সাম্যবাদের সবচেয়ে বড় সমালোচক কে?
উত্তর: প্লেটোর শিষ্য অ্যারিস্টটল। তিনি বলেছেন এই ব্যবস্থা মানব প্রকৃতির বিরোধী।
প্রশ্ন: প্লেটোর সাম্যবাদ ও মার্কসের সাম্যবাদের মূল পার্থক্য কী?
উত্তর: প্লেটোর সাম্যবাদ নৈতিক ও আংশিক, মার্কসের সাম্যবাদ অর্থনৈতিক ও সর্বজনীন।
উপসংহার
প্লেটোর সাম্যবাদ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি অনন্য চিন্তাভাবনা। নৈতিক বিশুদ্ধতা ও দুর্নীতিমুক্ত শাসন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে প্রণীত এই তত্ত্ব তৎকালীন সময়ে বৈপ্লবিক ছিল। যদিও অ্যারিস্টটলসহ অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এটিকে অবাস্তব বলেছেন, তবু শাসকদের লোভমুক্ত ও দায়বদ্ধ রাখার প্লেটোর এই প্রচেষ্টা আজও চিন্তার খোরাক জোগায়। প্লেটোর সাম্যবাদ আধুনিক মার্কসবাদী সাম্যবাদ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন — এটি মূলত একটি নৈতিক-রাজনৈতিক প্রস্তাব, অর্থনৈতিক বিপ্লবের কর্মসূচি নয়।
প্লেটোর সাম্যবাদ কি? সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য ও সমালোচনা করা হল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাসে প্লেটোর সাম্যবাদ একটি অনন্য ও বিতর্কিত তত্ত্ব। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটো তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “Republic”-এ আদর্শ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যে সাম্যবাদী ব্যবস্থার প্রস্তাব করেছিলেন, তা আধুনিক সাম্যবাদ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। প্লেটোর সাম্যবাদ কি — এই প্রশ্নটি রাষ্ট্রবিজ্ঞান, রাজনৈতিক তত্ত্ব ও বিসিএস পরীক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। এই আর্টিকেলে প্লেটোর সাম্যবাদের সংজ্ঞা, দুটি ভাগ, বৈশিষ্ট্য, সমালোচনা এবং আধুনিক সাম্যবাদের সাথে পার্থক্য বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
প্লেটোর সাম্যবাদ কি? সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য ও সমালোচনা
প্লেটোর সাম্যবাদ হলো তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য রিপাবলিক’-এ (The Republic) বর্ণিত একটি আদর্শ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উপায়। দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতিমুক্ত একটি দক্ষ শাসক শ্রেণি তৈরির উদ্দেশ্যে তিনি রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও পরিবার প্রথা বিলোপের এই তত্ত্ব প্রস্তাব করেন, যা কেবল শাসক ও সৈনিকদের জন্যই প্রযোজ্য ছিল।
প্লেটোর সাম্যবাদ কি?
গ্রিক দার্শনিক প্লেটো তাঁর আদর্শ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অভিভাবক শ্রেণির ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও পারিবারিক সম্পর্ক বিলোপের মাধ্যমে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে শাসনকার্য পরিচালনার জন্য যে প্রস্তাব পেশ করেন তাই হলো প্লেটোর সাম্যবাদ।
সহজ কথায়, প্লেটো বিশ্বাস করতেন যে শাসক ও সৈনিক শ্রেণীর যদি ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও পরিবার থাকে, তাহলে তারা স্বার্থপর হয়ে পড়বেন এবং রাষ্ট্রের ক্ষতি করবেন। তাই এই দুই শ্রেণীর জন্য সম্পত্তি ও পরিবার উভয়েরই বিলোপ সাধন করতে চেয়েছিলেন তিনি।
মূলগ্রন্থ: Republic (প্রজাতন্ত্র) ইংরেজি পরিভাষা: Plato’s Theory of Communism
প্লেটোর সাম্যবাদের উদ্দেশ্য
প্লেটোর সাম্যবাদের মূল লক্ষ্য ছিল তিনটি:
১. দুর্নীতিমুক্ত শাসন নিশ্চিত করা: শাসক শ্রেণী যাতে ব্যক্তিগত লোভ-লালসার বশবর্তী না হয়।
২. ঐক্য প্রতিষ্ঠা: রাষ্ট্রে সর্বোচ্চ ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা। প্লেটো মনে করতেন, “আমার” ও “তোমার” এই ধারণাই বিভেদের মূল।
৩. ন্যায়ধর্ম প্রতিষ্ঠা: সাম্যবাদের মূল লক্ষ্য মানুষের চিত্তকে পরিপূর্ণরূপে পরিশুদ্ধ করে ন্যায়ধর্মের অনুগত করা।
প্লেটোর সাম্যবাদের দুটি ভাগ
প্লেটোর সাম্যবাদ দুটি প্রধান ভাগে বিভক্ত:
১. সম্পত্তির সাম্যবাদ (Communism of Property)
প্লেটো তাঁর সাম্যবাদ ব্যবস্থায় শাসক এবং সৈনিক শ্রেণীর জন্য ব্যক্তিগত সম্পত্তি প্রথার বিলোপ সাধন করতে চেয়েছেন। কারণ তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, ব্যক্তিগত সম্পত্তি মানুষকে স্বার্থান্বেষী এবং লোভী করে তোলে।
মূল বিধান:
- অভিভাবক ও সৈনিক শ্রেণী কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি রাখতে পারবে না
- তারা রাষ্ট্র-নির্ধারিত ব্যারাকে বাস করবে
- রাষ্ট্রই তাদের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করবে
- সোনা-রুপা স্পর্শ করা নিষিদ্ধ
সতর্কতা: এই বিধান শুধু অভিভাবক ও সৈনিক শ্রেণীর জন্য — কৃষক ও কারিগর শ্রেণী ব্যক্তিগত সম্পত্তি রাখতে পারবে।
২. পরিবারের সাম্যবাদ (Communism of Family)
কেবলমাত্র সম্পত্তির উৎখাত হলেই সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠিত হবে না, এর জন্য পরিবারেরও বিলুপ্তির প্রয়োজন বলে প্লেটো বিশ্বাস করতেন। পরিবারকে তিনি জ্ঞানীদের অপচয়ের স্থান বলে বর্ণনা করেন।
মূল বিধান:
- অভিভাবক শ্রেণীর কোনো স্থায়ী বৈবাহিক সম্পর্ক থাকবে না
- নারী ও পুরুষ উভয়েই শাসন ও সামরিক দায়িত্ব পালন করতে পারবে
- সন্তান জন্মের পর রাষ্ট্র তাদের লালন-পালন করবে — পিতামাতা সন্তানকে চিনবে না
- বিবাহ হবে রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত — কেবল উৎকৃষ্ট বংশধর সৃষ্টির জন্য
প্লেটোর সাম্যবাদের বৈশিষ্ট্য
প্লেটোর সাম্যবাদ ব্যবস্থায় অভিভাবক শ্রেণীর কোনো প্রকার ব্যক্তিগত সম্পত্তি থাকতে পারবে না। তাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব রাষ্ট্র গ্রহণ করবে। সাম্যবাদের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
- শ্রেণি-নির্দিষ্ট: শুধুমাত্র শাসক ও সৈনিক শ্রেণীর জন্য — সর্বজনীন নয়
- রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত: রাষ্ট্রই সব ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করবে
- ঐক্যমুখী: “আমার” ও “তোমার” ধারণা দূর করে ঐক্য প্রতিষ্ঠা
- নৈতিক উদ্দেশ্যে: লোভ, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি দূর করার জন্য
- পুরুষ-নারী সমান: নারীরাও পুরুষের মতো শাসন ও সামরিক দায়িত্ব পাবে
প্লেটোর সাম্যবাদের সমালোচনা
প্লেটোর সাম্যবাদ তত্ত্ব প্রশংসার দাবিদার হলেও বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েছে:
অ্যারিস্টটলের সমালোচনা: অ্যারিস্টটল প্লেটোর সবচেয়ে তীব্র সমালোচক। তিনি বলেছেন — সম্পত্তির সাম্যবাদ মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে। মানুষ স্বভাবতই নিজের সম্পত্তিতে বেশি যত্নশীল।
পরিবার বিলোপের বিরুদ্ধে: পরিবার মানুষের সবচেয়ে স্বাভাবিক প্রতিষ্ঠান। পরিবার বিলোপ করলে মানবিক আবেগ ও সম্পর্কের বিনাশ হবে। পিতামাতা-সন্তানের স্বাভাবিক বন্ধন একটি মৌলিক মানবিক অধিকার।
শুধু এক শ্রেণীর জন্য: প্লেটোর সাম্যবাদ সর্বজনীন নয় — শুধু শাসক ও সৈনিক শ্রেণীর জন্য। কৃষক ও কারিগর শ্রেণী ব্যক্তিগত সম্পত্তি রাখতে পারে — এটি বৈষম্যমূলক।
অবাস্তব ও কাল্পনিক: মানব প্রকৃতির বিরুদ্ধে এ ধরনের ব্যবস্থা বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
প্লেটোর সাম্যবাদ ও আধুনিক সাম্যবাদের পার্থক্য
প্লেটোর সাম্যবাদ ও মার্কসবাদী আধুনিক সাম্যবাদ এক নয়:
| বিষয় | প্লেটোর সাম্যবাদ | আধুনিক সাম্যবাদ (মার্কসবাদ) |
|---|---|---|
| উদ্দেশ্য | নৈতিক বিশুদ্ধতা ও দুর্নীতিমুক্ত শাসন | শ্রেণিশোষণ দূর করা |
| প্রযোজ্যতা | শুধু শাসক ও সৈনিক শ্রেণীর জন্য | সমাজের সকল শ্রেণীর জন্য |
| সম্পত্তি | শুধু শাসকদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বিলোপ | সকলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বিলোপ |
| মালিকানা | রাষ্ট্রীয় মালিকানা আংশিক | উৎপাদনের উপকরণে সম্পূর্ণ সামষ্টিক মালিকানা |
| পরিবার | অভিভাবক শ্রেণীতে পরিবার বিলোপ | পরিবার বিলোপের কথা বলে না |
| ভিত্তি | নৈতিক ও আদর্শবাদী | অর্থনৈতিক ও বস্তুবাদী |
| প্রবক্তা | প্লেটো (৪২৮-৩৪৮ খ্রিপূ) | কার্ল মার্কস (১৮১৮-১৮৮৩) |
প্লেটোর সাম্যবাদের আধুনিক মূল্যায়ন
প্লেটোর সাম্যবাদ সমালোচিত হলেও এর মধ্যে কিছু প্রগতিশীল দিক রয়েছে:
- নারীর সমান অধিকারের কথা বলেছেন — যা সেই যুগে অত্যন্ত বিপ্লবী ছিল
- শাসকদের দুর্নীতিমুক্ত রাখার প্রচেষ্টা প্রশংসনীয়
- ক্ষমতাসীনদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান
(FAQ)
প্রশ্ন: প্লেটোর সাম্যবাদ কি?
উত্তর: আদর্শ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অভিভাবক ও সৈনিক শ্রেণীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও পরিবার বিলোপের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত শাসন প্রতিষ্ঠার যে প্রস্তাব প্লেটো করেছিলেন তাকে প্লেটোর সাম্যবাদ বলে।
প্রশ্ন: প্লেটোর সাম্যবাদ কত প্রকার?
উত্তর: দুই প্রকার — সম্পত্তির সাম্যবাদ ও পরিবারের সাম্যবাদ।
প্রশ্ন: প্লেটোর সাম্যবাদ কোন গ্রন্থে বর্ণিত?
উত্তর: প্লেটোর বিখ্যাত গ্রন্থ “Republic” (প্রজাতন্ত্র)-এ।
প্রশ্ন: প্লেটোর সাম্যবাদ কি সর্বজনীন?
উত্তর: না। এটি শুধু শাসক ও সৈনিক শ্রেণীর জন্য — কৃষক ও কারিগর শ্রেণী ব্যক্তিগত সম্পত্তি রাখতে পারে।
প্রশ্ন: প্লেটোর সাম্যবাদের সবচেয়ে বড় সমালোচক কে?
উত্তর: প্লেটোর শিষ্য অ্যারিস্টটল। তিনি বলেছেন এই ব্যবস্থা মানব প্রকৃতির বিরোধী।
প্রশ্ন: প্লেটোর সাম্যবাদ ও মার্কসের সাম্যবাদের মূল পার্থক্য কী?
উত্তর: প্লেটোর সাম্যবাদ নৈতিক ও আংশিক, মার্কসের সাম্যবাদ অর্থনৈতিক ও সর্বজনীন।
উপসংহার
প্লেটোর সাম্যবাদ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি অনন্য চিন্তাভাবনা। নৈতিক বিশুদ্ধতা ও দুর্নীতিমুক্ত শাসন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে প্রণীত এই তত্ত্ব তৎকালীন সময়ে বৈপ্লবিক ছিল। যদিও অ্যারিস্টটলসহ অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এটিকে অবাস্তব বলেছেন, তবু শাসকদের লোভমুক্ত ও দায়বদ্ধ রাখার প্লেটোর এই প্রচেষ্টা আজও চিন্তার খোরাক জোগায়। প্লেটোর সাম্যবাদ আধুনিক মার্কসবাদী সাম্যবাদ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন — এটি মূলত একটি নৈতিক-রাজনৈতিক প্রস্তাব, অর্থনৈতিক বিপ্লবের কর্মসূচি নয়।
